শনি. জুন ২২, ২০২৪

মাসুম হাওলাদার;

বাগেরহাটের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য দেয়া বরাদ্দ অর্থ শিক্ষক ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির যোগসাজসে লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।
অনেক বিদ্যালয়ে কাজ না করে ভুয়া ভাউচার করে টাকা তুলে ভাগাভাগি করে নেয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও জানেন না এ টাকা কিভাবে খরচ হয়েছে।এসব অভিযোগ ক্ষতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম। বাগেরহাট জেলার ৯টি উপজেলায় একহাজার ১৬২ প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে ৯ উপজেলায় মোট ৩৯৬টি বিদ্যালয়ে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা করে বরাদ্দ আসে। তবে অনেক বিদ্যালয়েই কাজ না করে ভুয়া ভাউচার দিয়ে টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য আলমগীর হোসেন মীরু দুর্নীতি দমন কশিন (দুদক) ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য ২ লাখ, স্লিপের ৫০ হাজার এবং সিএফএস এর একলাখ টাকা বরাদ্দ আসে। দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক সাইদুল হক এ টাকা আত্মসাত করেছেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে কোন আলোচনাও করেননি তিনি।
ওই বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির আরেক সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন মাসুম বলেন, প্রধান শিক্ষক সাইদুল হক দীর্ঘদিন এখানে আছেন। তিনি বিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাৎসহ নানা প্রকার অনিয়ম করে আসছেন।এলাকাবাসী শাহজাহান আকন বলেন, প্রধান শিক্ষক ১০-১২ বছর ধরে বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাতে প্রাইভেট পড়ান। উপ-বৃত্তির তালিকা থেকে ইচ্ছেমত শিশুদের নাম কর্তন করেন। এসব বিষয় জানতে চাইলে তিনি আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। শুনেছি এ বছর স্কুলে বেশ কিছু টাকা বরাদ্দ এসেছে। কিন্তু স্কুলে কোন কাজ করতে আমরা দেখিনি।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক সাইদুল হক বলেন, মৌখিকভাবে ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমতি নিয়ে ক্ষুদ্র মেরামতের টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজ করেছি। টাকা খরচের বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা সব জানেন।
রায়েন্দা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মধু বলেন, বিদ্যালয়ে টাকা বরাদ্দ আসছে জানালেও খরচের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আমাকে কিছুই জানাননি।
শরণখোলা উপজেলার দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব খাদা ও পোলেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায় একই চিত্র। কাজ না করে টাকা তুলে নেয়ার একই অভিযোগ উঠেছে শরণখোলা উপজেলায় বরাদ্দ পাওয়া ৪৪টি বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। অন্যান্য উপজেলায়ও বেশ কিছু অনিয়ম রয়েছে।
অনিয়মের বিষয়ে কথা বলার জন্য শরণখোলা উপজেলা শিক্ষা অফিসে গেলে গণমাধ্যম কর্মী পরিচয় পেয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম সটকে পড়েন। পরবর্তীতে ফোন করলে তিনি ফোন কেটে দেন।তবে সহকারি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রতন কুমার বল বলেন, এসব দেখার দায়িত্ব তার নয়। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাই দেখবেন আর্থিক বিষয়গুলো।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহীন বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়মের যে বিষয় উঠেছে সেসব বিষয়ে অভিযোগ পেলে আমরা তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।জেলার বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, ফকিরহাট উপজেলায় ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য ২২টি বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ এসেছে। শিক্ষা অফিস জানিয়েছে সবগুলো বিদ্যালয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চিতলমারীতে বরাদ্দ পাওয়া ৪৩টি বিদ্যালয়ে কাজ চলছে। তবে বরাদ্দ পাওয়া টাকার কতটুকু কাজ হবে এ নিয়ে শঙ্কা আছে স্থানীয়দের মাঝে।মোল্লাহাট উপজেলায় ৩৪টি বিদ্যালয় বরাদ্দ পেলেও শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী কাজ হয়েছে মাত্র ৩১টি বিদ্যালয়ে। তবে এতেও রয়েছে নানা অভিযোগ। বাগেরহাট সদর উপজেলায় ৫৫টি বিদ্যালয়ে বরাদ্দ পেলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৩টি বিদ্যালয়ে। অন্য বিদ্যালয়গুলোতে প্রথা নিয়মে কাজ করা হবে, করোনার কারণে দেরি হচ্ছে বলে জানানো হয়।রামপাল উপজেলায় বরাদ্দ পাওয়া ৩৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩টি বিদ্যালয়ের কাজ হয়েছে। অর্থবছর শেষ হলেও অন্যগুলোর কাজ কবে হবে জানে না উপজেলা শিক্ষা অফিস।মোংলা উপজেলায় বরাদ্দ পাওয়া ১৪টি বিদ্যালয়ের কাজ চলছে। মোরেলগঞ্জে বরাদ্দ পাওয়া ১০৪টি বিদ্যালয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিস। তবে বাস্তবে কোন কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
কচুয়া উপজেলায় ৪৭টি বিদ্যালয়ে বরাদ্দ আসলেও কাজ হয়েছে মাত্র ১৫টির। অন্যগুলোর কাজ হবে কিনা শঙ্কায় রয়েছে অভিভাবকরা।
বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, সরেজমিনে গিয়ে মেরামতে কাজ দেখে বিল প্রদানের জন্য সকল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। আমরা তদন্তপূর্বক এসব অনিয়মের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো##

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *